সেপ্টেম্বর থেকে তেল উৎপাদন আরও বাড়াবে ওপেক প্লাস, শেষ হলো স্বেচ্ছা উৎপাদন-হ্রাস প্রত্যাহারের ধাপ
লন্ডন, ২ আগস্ট
রবিবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে গৃহীত এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ২০২৩ সালে গৃহীত স্বেচ্ছা উৎপাদন-হ্রাস কর্মসূচির শেষ অংশটিও কার্যকরভাবে প্রত্যাহার করা হলো। সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির আওতায় দৈনিক প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল উৎপাদন কমিয়ে রাখা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরে ওপেক প্লাস একাধিকবার উৎপাদন বৃদ্ধির ঘোষণা দিলেও বাস্তব বাজারে তার পূর্ণ প্রভাব দৃশ্যমান হয়নি। ইরান ও ইউক্রেনকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত, রপ্তানি অবকাঠামোর বিঘ্ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতার কারণে ঘোষিত উৎপাদনের একটি বড় অংশ কার্যত বাজারে পৌঁছাতে পারেনি।
সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরাক, কুয়েত, আলজেরিয়া, কাজাখস্তান এবং ওমান—এই সাতটি মূল সদস্য দেশের অংশগ্রহণে গৃহীত সর্বশেষ সিদ্ধান্তের ফলে স্বেচ্ছা উৎপাদন-হ্রাস প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলো। উল্লেখ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত পূর্বে এই ব্যবস্থার অংশ হলেও মে মাসে ওপেক থেকে সরে যাওয়ার পর আর এ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত নেই।
চতুর্থ প্রান্তিকে উৎপাদন নীতিতে কী আসছে?
বৈঠকের আগে বিভিন্ন সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিকে ওপেক প্লাস উৎপাদন বৃদ্ধির গতি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়নি।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির বিশ্লেষক জর্জ লিওনের মতে, স্বেচ্ছা উৎপাদন-হ্রাস পুরোপুরি প্রত্যাহারের পর ওপেক প্লাসের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হবে সম্ভাব্য অতিরিক্ত সরবরাহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা।
তিনি বলেন, উৎপাদন পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য অর্জিত হওয়ায় জোটের সদস্যদের দ্রুত নতুন সরবরাহ পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। ফলে বছরের শেষ তিন মাস উৎপাদন স্থিতিশীল রাখার সম্ভাবনাই বেশি।
জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
একই দিনে অনুষ্ঠিত যৌথ মন্ত্রীপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ কমিটির (JMMC) বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাবও আলোচনায় আসে। কমিটি জ্বালানি স্থাপনার ওপর হামলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, এ ধরনের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা মেরামত করতে বিপুল ব্যয় ও দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এখনও বহাল রয়েছে আরেক দফা উৎপাদন সীমাবদ্ধতা
সেপ্টেম্বরের উৎপাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও ওপেক প্লাসের অধিকাংশ সদস্য দেশের ওপর আরোপিত প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল দৈনিক উৎপাদন-সীমাবদ্ধতা এখনও বহাল রয়েছে। ২০২২ সালে গৃহীত এই ব্যবস্থা চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা।
২০২৭ সালের নতুন কোটা নির্ধারণের প্রস্তুতি
ওপেক প্লাস বর্তমানে সদস্য দেশগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়নের কাজ করছে। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ২০২৭ সালের উৎপাদন কোটা নির্ধারণ করা হবে।
তবে বিষয়টি সহজ হবে না বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে ইরাকসহ কয়েকটি দেশ তাদের প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার যুক্তিতে ভবিষ্যতে উচ্চতর উৎপাদন কোটা দাবি করতে পারে। ফলে আগামী বছরগুলোর কোটা-আলোচনা জোটের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে ওপেক প্লাসে ২১টি দেশ রয়েছে। এর মধ্যে ওপেকভুক্ত সদস্যদের পাশাপাশি রাশিয়া ও অন্যান্য সহযোগী উৎপাদক দেশও অন্তর্ভুক্ত। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব মূলত সাতটি প্রধান সদস্য দেশের হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল।
ওপেক প্লাসের এই সাত সদস্য দেশের পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা আগামী ৬ সেপ্টেম্বর। বৈশ্বিক তেলের চাহিদা, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনায় ওই বৈঠকে ভবিষ্যৎ উৎপাদন নীতির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Comments
Post a Comment