ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার আগে অর্থনৈতিক নীতিতে ‘লাল রেখা’ টানছে চীন

সিঙ্গাপুর/বেইজিং, ৩ আগস্ট

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য আলোচনা সামনে রেখে চীন তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশল নিয়ে আরও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে। বেইজিং স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক মডেলের মৌলিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই সীমিত।

চীনের নীতিনির্ধারকরা বারবার জোর দিয়ে বলছেন, উন্নত শিল্পখাত, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং উৎপাদন সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক মডেলই দেশটির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করার যে আহ্বান জানানো হচ্ছে, তার প্রতি বেইজিং এখনো সতর্ক ও সংযত অবস্থান বজায় রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সরকারি বক্তব্য ও নীতিগত বার্তাগুলো শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন নয়; বরং আসন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনার আগে নিজেদের অবস্থান সুস্পষ্ট করার একটি কৌশলগত প্রচেষ্টাও।

শিল্পভিত্তিক প্রবৃদ্ধির পক্ষে বেইজিং

চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বৈঠকে অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈঠকের পর প্রকাশিত বার্তায় ব্যাপক ভোক্তা-উদ্দীপনা কর্মসূচি বা অর্থনৈতিক কাঠামোর মৌলিক সংস্কারের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

এর আগে দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক নীতিপত্রে পশ্চিমা বিশ্বের "অতিরিক্ত শিল্প সক্ষমতা" (Industrial Overcapacity) সংক্রান্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। ওই নথিতে বলা হয়, চীনের শিল্পনীতি সম্পর্কে অনেক সমালোচনা বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যার ওপর বেশি নির্ভরশীল।

একই সময়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির তাত্ত্বিক সাময়িকী কিউশি (Qiushi)-তে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেশটির তুলনামূলক নিম্ন ভোগব্যয় হারকে ঐতিহাসিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ফলাফল হিসেবে তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, অবকাঠামো ও শিল্প বিনিয়োগনির্ভর উন্নয়ন মডেল চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাণিজ্য আলোচনার আগে কৌশলগত বার্তা

অর্থনীতিবিদদের মতে, চীনের সাম্প্রতিক অবস্থান মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

প্রথমত, বেইজিং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের বোঝাতে চায় যে তাদের অর্থনৈতিক কাঠামো দেশটির উন্নয়ন বাস্তবতা থেকে উদ্ভূত এবং তা পশ্চিমা অর্থনীতির মডেলের সঙ্গে সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়।

দ্বিতীয়ত, চীন স্পষ্ট করতে চাইছে যে, তার অর্থনৈতিক নীতির কিছু মৌলিক দিক নিয়ে আপসের সুযোগ সীমিত। বিশেষ করে চীনা কোম্পানি ও পণ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে নাএমন বার্তাও বিভিন্ন সরকারি বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।

চায়না শক নয়, চায়না সুযোগ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে "চায়না শক ২.০" নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধারণা অনুযায়ী, উন্নত প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে চীনের দ্রুত অগ্রগতি পশ্চিমা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।

তবে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং সম্প্রতি এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে "চায়না অপারচুনিটি ২.০" বা "চীনের নতুন সুযোগ" হিসেবে বিষয়টিকে উপস্থাপন করেন। তার মতে, চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, গবেষণা বিনিয়োগ এবং উৎপাদন দক্ষতা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করছে।

তবে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এ যুক্তির সঙ্গে একমত নন। তাদের মতে, দুর্বল অভ্যন্তরীণ ভোক্তা চাহিদার কারণে চীনের অর্থনীতি এখনও ব্যাপকভাবে রপ্তানিনির্ভর, যা বৈশ্বিক বাজারে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাড়তি উদ্বেগ

গত বছর যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বাণিজ্যিক চাপ বৃদ্ধির চেষ্টা করেছিল। তবে বিরল খনিজ (Rare Earths) উৎপাদনে চীনের আধিপত্যের কারণে বেইজিং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নও ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। ইউরোপের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের শিল্প ও সরকারি ক্রয়নীতি শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করছে।

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্ৎস সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন যে, চীনের মুদ্রানীতি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশটিকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।

আত্মবিশ্বাসী চীন, তবে সতর্ক পদক্ষেপ

পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে বেইজিং এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। তারা মনে করছে, বড় ধরনের নীতিগত ছাড় না দিয়েও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরোধগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

তবে একই সঙ্গে চীন কিছু অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও স্বীকার করছে। সরকার স্থানীয় প্রশাসনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ ও মূল্যযুদ্ধের সমস্যা মোকাবিলার অঙ্গীকার করেছে।

সরকারি নথিতেও সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, তবুও বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের রূপরেখা এখনো স্পষ্ট নয়।

আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাড়ছে উদ্বেগ

বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক সংস্থা চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক মডেল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, চীনের শিল্প খাতের উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি সহায়তা ও ভর্তুকির সুবিধা পেয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করেছে।

এছাড়া অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়ের দুর্বলতা এবং অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা দেশটির রপ্তানি বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

আরেকটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, চীন প্রতি বছর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত বিনিয়োগের তুলনায় বহু গুণ বেশি উৎপাদনশীল সম্পদ তৈরি করছে। তবে সেই বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আর্থিক রিটার্ন তুলনামূলকভাবে কম, যা দীর্ঘমেয়াদে দক্ষতা ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

সামনে কঠিন আলোচনা

বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একদিকে পশ্চিমা দেশগুলো বাজার ভারসাম্য, শিল্পনীতি এবং বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়ে উদ্বেগ জানাবে; অন্যদিকে চীন তার উন্নয়ন মডেলের মৌলিক কাঠামো রক্ষায় অনড় অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করবে।

ফলে ভবিষ্যৎ আলোচনা শুধু বাণিজ্য নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেতৃত্ব, শিল্প প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Comments