চীনে জার্মান পণ্যের চাহিদা কমছে, বাণিজ্য ঘাটতি পৌঁছেছে রেকর্ড উচ্চতায়
বার্লিন:
জার্মানির রাষ্ট্রীয় সংস্থা জার্মানি ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টের (GTAI) প্রাথমিক তথ্যের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চীনে জার্মানির পণ্য রপ্তানি ১২ শতাংশেরও বেশি কমে ৩৭ বিলিয়ন ইউরোর নিচে নেমে গেছে।
রপ্তানি বাজার হিসেবে চীনের গুরুত্ব কমে যাওয়ায় দেশটি এখন জার্মানির পণ্য রপ্তানির তালিকায় নবম অবস্থানে রয়েছে। কয়েক বছর আগেও চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার থেকে নবম স্থানে
২০২১ সালের দিকে চীন ছিল জার্মানির দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। করোনা মহামারির প্রভাব সত্ত্বেও ওই বছর জার্মানি চীনের বাজারে প্রায় ১০৪ বিলিয়ন ইউরোর পণ্য বিক্রি করেছিল।
কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছরে চীনা বাজারে জার্মান পণ্যের চাহিদা কমেছে। বিশেষ করে চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য শিল্পপণ্যে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে।
এর ফলে জার্মানির ঐতিহ্যবাহী শিল্পপণ্য, যন্ত্রপাতি ও গাড়ি খাত চীনের বাজারে আগের মতো সুবিধা ধরে রাখতে পারছে না।
আমদানি বাড়ছে, রপ্তানি কমছে
দুই দেশের বাণিজ্য পরিসংখ্যানে এই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট।
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনের সঙ্গে জার্মানির বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ৪০ বিলিয়ন ইউরো। ২০২৬ সালের একই সময়ে ঘাটতি বেড়ে প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে।
এই সময়ে চীন থেকে জার্মানির আমদানি ৮ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৯১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। বিপরীতে জার্মানির রপ্তানি কমে যাওয়ায় দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য আরও চীনের দিকে ঝুঁকেছে।
ফলে জানুয়ারি-জুন সময়ে দুই দেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ১২৮ বিলিয়ন ইউরোর বেশি হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জার্মানির মোট বাণিজ্যের তুলনায় চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউরো বেশি।
তবে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ বেশি হওয়া সত্ত্বেও জার্মানির জন্য চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের অন্যতম বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি।
জার্মান শিল্পে দ্বিমুখী চাপ
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য পরিস্থিতির এই পরিবর্তন এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন জার্মানির উৎপাদনশিল্প নিজেই বড় ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
দেশটির শিল্পখাতকে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত শুল্কনীতি ও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে চীনা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে মূল্য, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতার প্রতিযোগিতাও ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
বিশেষ করে গাড়ি শিল্পে পরিস্থিতি বেশ কঠিন। জার্মানির অন্যতম প্রধান গাড়ি নির্মাতা ভক্সওয়াগেনসহ বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় কমানো, উৎপাদন পুনর্গঠন এবং কর্মীসংখ্যা কমানোর মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির জন্য এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক সমস্যা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে জার্মান অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
চীনের ওপর জার্মানির পুরনো নির্ভরতার পরিবর্তন
দীর্ঘদিন ধরে চীন জার্মান শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার এবং সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে গাড়ি, শিল্পযন্ত্র, রাসায়নিক পণ্য ও উচ্চমূল্যের উৎপাদনসামগ্রীর ক্ষেত্রে চীনের বাজার জার্মান কোম্পানিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অন্যদিকে চীন থেকে জার্মানি বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, যন্ত্রাংশ, শিল্পপণ্য এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্য আমদানি করে।
এখন সেই সম্পর্কের ভারসাম্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। জার্মান কোম্পানিগুলোর চীনা বাজারে রপ্তানি কমলেও চীনা পণ্য জার্মান বাজারে প্রবেশের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
এটি জার্মানির শিল্প ও বাণিজ্য নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
ছোট ইউরোপীয় বাজারও এগিয়ে যাচ্ছে
আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ডের মতো তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির দেশগুলোও চীনের চেয়ে বেশি জার্মান পণ্য আমদানি করেছে।
এর অর্থ হলো, চীনা বাজারে জার্মান রপ্তানির পতন শুধু একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়; বরং জার্মান রপ্তানি কাঠামোর ভৌগোলিক বৈচিত্র্যেও এর প্রভাব পড়ছে।
জার্মানির ব্যবসা ও শিল্পখাতের জন্য নতুন বাজার খোঁজা এবং বিদ্যমান বাজারগুলোতে প্রতিযোগিতা বাড়ানো তাই ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিও বড় কারণ
জার্মান-চীন বাণিজ্যের এই পরিবর্তনের পেছনে বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনও ভূমিকা রাখছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতি ও শুল্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে জার্মান পণ্যের রপ্তানিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালে এই পরিবর্তনের মধ্যেই চীন জার্মানির সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যায়।
তবে চীনের সঙ্গে জার্মানির বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত বাড়তে থাকায় বার্লিনের সামনে এখন নতুন প্রশ্ন—চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে কীভাবে নিজেদের শিল্প ও রপ্তানি সক্ষমতা সুরক্ষিত রাখা যায়।
জার্মান অর্থনীতির সামনে নতুন বাস্তবতা
সাম্প্রতিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান জার্মান অর্থনীতির জন্য একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একসময় যে চীনা বাজার জার্মান শিল্পপণ্যের অন্যতম প্রধান গন্তব্য ছিল, সেই বাজারে এখন জার্মান রপ্তানি ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।
একই সময়ে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে বৈশ্বিক বাজারে আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে। ফলে জার্মান কোম্পানিগুলোকে শুধু চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারেই নয়, তৃতীয় দেশের বাজারেও চীনা প্রতিযোগীদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
জার্মানির জন্য তাই চ্যালেঞ্জটি দ্বিমুখী—একদিকে গুরুত্বপূর্ণ চীনা বাজারে রপ্তানি ধরে রাখা, অন্যদিকে চীনা আমদানির ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে নিজেদের শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করা।
চীন এখন জার্মানির সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও রপ্তানি বাজার হিসেবে দেশটির গুরুত্ব দ্রুত কমছে। বিপরীতে চীনের পণ্য জার্মান বাজারে প্রবেশ আরও বাড়ছে।
এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্প অর্থনীতি জার্মানির জন্য চীনের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্পর্ক শুধু প্রবৃদ্ধির সুযোগ নয়, বরং প্রতিযোগিতা, শিল্প সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।

Comments
Post a Comment