ইরান সংকট নিরসনের সম্ভাবনায় উজ্জীবিত অস্ট্রেলিয়ার শেয়ারবাজার, ব্যাংক ও স্বাস্থ্যখাতের নেতৃত্বে উত্থান

সিডনি, ৩ আগস্ট  

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা এবং ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক অগ্রগতির আশাবাদকে কেন্দ্র করে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে অস্ট্রেলিয়ার শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ব্যাংক, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বর্ণ উত্তোলনকারী কোম্পানির শেয়ারে শক্তিশালী ক্রয়ের ফলে বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার বেঞ্চমার্ক S&P/ASX 200 সূচক সোমবার প্রায় ০.৫ শতাংশ বেড়ে ৯,০১৯.৩০ পয়েন্টে পৌঁছেছে। জুলাই মাসে শক্তিশালী পারফরম্যান্সের পর নতুন মাসের শুরুতেও বাজার সেই ইতিবাচক গতি ধরে রেখেছে। জুলাই ছিল গত পাঁচ মাসের মধ্যে সূচকটির অন্যতম সেরা মাসিক পারফরম্যান্সের সময়।


ইরান ইস্যুতে কূটনৈতিক অগ্রগতির আশায় বাজারে স্বস্তি

বাজারের ইতিবাচক মনোভাবের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন আশাবাদ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি জানান, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় সম্পূর্ণভাবে চালু করার জন্য একটি চুক্তি চূড়ান্ত করতে সময় চেয়েছে

বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা বৈশ্বিক তেলের সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সম্ভাব্য উত্তেজনা প্রশমনের খবর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়েছে।

তবে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।

KCM Trade-এর প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উন্নয়নকে বাজার ইতিবাচক হিসেবে দেখছে, তবে এটিকে এখনো বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া না যায়, ততক্ষণ বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান বজায় রাখবেন এবং ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে বেছে বেছে এগোবেন।


ব্যাংক খাতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, বড় চার ব্যাংকের তিনটির শেয়ার ঊর্ধ্বমুখী

সোমবারের বাজারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আর্থিক খাত।

অস্ট্রেলিয়ার ব্যাংকিং খাতের সূচক প্রায় ০.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছেদেশটির বৃহৎ চার ব্যাংকের মধ্যে তিনটির শেয়ার মূল্য ০.২ শতাংশ থেকে ০.৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে

তবে বিনিয়োগকারীরা এখনো ব্যাংক খাত নিয়ে সতর্ক রয়েছেন। কারণ:

  • ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা পুনরায় বাড়লে জ্বালানি মূল্য চাপে পড়তে পারে,

  • উচ্চ তেলের দাম মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে,

  • এর ফলে সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা বিলম্বিত হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, চলমান আয় প্রকাশ মৌসুমে বিনিয়োগকারীদের মূল আগ্রহ থাকবে ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিবেশ, ঋণ প্রবৃদ্ধি এবং মুনাফার স্থায়িত্বের দিকে।


RBA সুদের হার নিয়ে বাজারে স্থিতিশীল প্রত্যাশা

অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া (RBA)-এর আসন্ন নীতি বৈঠক নিয়েও বাজারে আলোচনা চলছে।

বর্তমানে বাজারের ধারণা, আগামী সপ্তাহের বৈঠকে RBA-এর ৪.৩৫ শতাংশ নগদ সুদের হার বৃদ্ধি করার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে

এছাড়া সেপ্টেম্বর মাসেও সুদের হারে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুব সীমিত বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা।

তবে জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


স্বাস্থ্যসেবা ও ভোক্তা খাতেও শক্তিশালী উত্থান

ব্যাংক ছাড়াও স্বাস্থ্যসেবা এবং ভোক্তা পণ্যের কোম্পানিগুলো বাজারকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতের সূচক প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে

এই খাতে 4DMedical উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে।

একইভাবে ভোক্তা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খাতও প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছেএই খাতে Treasury Wine Estates শীর্ষ পারফর্মারদের মধ্যে ছিল।


স্বর্ণ কোম্পানির শেয়ারে উত্থান, তেলের পতনে চাপে জ্বালানি খাত

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির সুবিধা পেয়েছে অস্ট্রেলিয়ার স্বর্ণ উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।

স্বর্ণ খাতের সূচক প্রায় ০.৭ শতাংশ বেড়েছে

অন্যদিকে, বাজারের সামগ্রিক উত্থানকে কিছুটা সীমিত করেছে জ্বালানি খাতের দুর্বল পারফরম্যান্স।

তেলের দাম কমে যাওয়ায় জ্বালানি খাতের সূচক ১.২ শতাংশ কমেছে, যা প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে এই খাতের সবচেয়ে দুর্বল পারফরম্যান্স।

দেশটির প্রধান জ্বালানি কোম্পানিগুলোর মধ্যে:

  • Woodside Energy-এর শেয়ার প্রায় ১.৪ শতাংশ কমেছে,

  • Santos-এর শেয়ার কমেছে প্রায় ১.৯ শতাংশ


বিনিয়োগকারীদের নজর এখন কর্পোরেট আয় মৌসুমে

বাজারের পরবর্তী দৃষ্টি এখন আগস্ট মাসের কর্পোরেট আয় প্রকাশের দিকে।

বিনিয়োগকারীরা দেখতে চান, অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানিগুলো:

  • উচ্চ সুদের হার,

  • জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি,

  • বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা,

এসব চ্যালেঞ্জ কতটা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন আয় প্রতিবেদনগুলো অস্ট্রেলিয়ার কর্পোরেট খাতের প্রকৃত স্বাস্থ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেবে।


নিউজিল্যান্ডের বাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা

অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রবাহ দেখা গেছে।

দেশটির বেঞ্চমার্ক S&P/NZX 50 সূচক সোমবার প্রায় ০.৬ শতাংশ বেড়ে ১৩,৭৭৪.৯৩ পয়েন্টে অবস্থান করেছে।


বাজারের সার্বিক চিত্র

অস্ট্রেলিয়ার শেয়ারবাজার বর্তমানে তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে:

  1. মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরান ইস্যুর অগ্রগতি;

  2. বিশ্বব্যাপী তেলের দামের গতিপথ;

  3. স্থানীয় কোম্পানিগুলোর আয় ও RBA-এর সুদের হার নীতি।

যদিও ইরান সংকট ঘিরে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা বাজারে স্বস্তি এনেছে, তবে বিনিয়োগকারীরা এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনো ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি, মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হার সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার বাজারের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে কর্পোরেট আয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিই হবে প্রধান চালিকাশক্তি।

 

Comments