হরমুজ প্রণালীর ভয়ংকর চাপ! ইরানের কৌশলে কি আবার আলোচনায় ফিরতে বাধ্য হবে যুক্তরাষ্ট্র?
ইরানের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে জেডি ভ্যান্সের বিস্ফোরক অভিযোগ
জনপ্রিয় পডকাস্ট উপস্থাপক জো রোগানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করার জন্য একটি "গোপন ও অত্যন্ত অর্থায়ন-সমৃদ্ধ প্রচারণা" পরিচালিত হচ্ছে।
ভ্যান্সের অভিযোগ অনুযায়ী, টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এমন কিছু ব্যক্তির কথা উঠে এসেছে, যারা একজন সাবেক ট্রাম্প প্রচারণা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অর্থায়নে তার বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি আরও দাবি করেন, ওই কর্মকর্তার অর্থের উৎস ছিল ইসরায়েলি সরকারের কিছু অংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী।
তার ভাষায়, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করাই যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। তবে তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, বিদেশি শক্তিগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে, এটি স্বাভাবিক; কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, মার্কিন নেতৃত্বের একটি অংশ সেই প্রভাবকে নিজেদের নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও স্পষ্ট
আন্তর্জাতিক ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ক অধ্যাপক সাইরাস শায়ার মনে করেন, ভ্যান্সের বক্তব্য আসলে মার্কিন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে বিদ্যমান গভীর মতপার্থক্যের প্রতিফলন।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে একদিকে এমন একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে যারা ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণের পক্ষে। অন্যদিকে জেডি ভ্যান্স এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিশ্বাস করেন, দীর্ঘমেয়াদে একটি সমঝোতামূলক চুক্তি রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে বেশি লাভজনক হতে পারে।
ইসরায়েলের অবস্থান: প্রকাশ্য সমর্থন, নেপথ্যে ভিন্নমত
বিশ্লেষক শায়ার আরও উল্লেখ করেন যে, ২০২৫ সালের পর ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে নীতিগতভাবে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সমন্বয় গড়ে উঠেছিল।
তবে তিনি দাবি করেন, ইরানে সরকার পরিবর্তনের মতো কঠোর পদক্ষেপের প্রশ্নে ইসরায়েলের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কর্মকর্তা নেতানিয়াহুর সঙ্গে একমত ছিলেন না। বরং কেবল নেতানিয়াহু এবং মোসাদের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ এ ধরনের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিল।
হরমুজ প্রণালী: ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত অস্ত্র
প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরানের কৌশলগত সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। অধ্যাপক শায়ারের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাত এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রস্তুতির ফলে ইরান এমন একটি "কৌশলগত লিভার" বা চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে।
এই সক্ষমতার বিশেষত্ব হলো, এটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকেই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, এশিয়া এবং সমগ্র বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে এটি একটি আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
শায়ারের মতে, অতীতের তুলনায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শক্তির ভারসাম্য অনেক বেশি সমতাভিত্তিক অবস্থানে পৌঁছেছে।
যদিও ইরান এখনও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রাস্ফীতি এবং মানবিক সংকটের মতো গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি, তবুও হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের প্রভাব আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর জন্য একটি বড় বাস্তবতা। এই কৌশলগত সুবিধা ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সামরিক চাপ মোকাবিলায় অতিরিক্ত সক্ষমতা প্রদান করছে।
উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং ওমানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো নতুন কোনো সামরিক সংঘাত দেখতে চায় না।
কারণ দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত শুধু তাদের নিরাপত্তাকেই নয়, বরং জ্বালানি রপ্তানি, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। ফলে এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তেজনা কমানোর জন্য কূটনৈতিকভাবে চাপ দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আলোচনার টেবিলে ফেরা কি অবশ্যম্ভাবী?
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে অধ্যাপক শায়ারের মূল্যায়ন বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত একজন কৌশলী রাজনৈতিক খেলোয়াড় (Tactician), দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণকারী (Strategist) নন।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য উত্তেজনা বাড়াতে পারেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তব পরিস্থিতির চাপে আবারও উত্তেজনা প্রশমনের পথ বেছে নেবেন। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনার সূচনা হওয়া প্রায় অনিবার্য।
তবে সেই প্রক্রিয়া দ্রুত ঘটবে না। এর আগে আরও কিছু রাজনৈতিক উত্তেজনা, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং আঞ্চলিক চাপের পর্ব দেখা যেতে পারে। তারপরই উভয় পক্ষ পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
উপসংহার
বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক শুধু দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ইস্যু নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সম্ভাব্য প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এবং আঞ্চলিক মিত্রদের উদ্বেগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে।
তবে এক বিষয় স্পষ্ট: সংঘাত যতই গভীর হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত কূটনীতিই হতে পারে এই সংকটের একমাত্র কার্যকর সমাধান।

Comments
Post a Comment