দিল্লির রাজপথে ‘ককরোচ পার্টি’ : প্রতীকী প্রতিবাদের আড়ালে নগর-রাজনীতির নতুন সমীকরণ

নয়াদিল্লি, ২৩ জুলাই ২০২৬
প্রতিবেদক: সিনিয়র আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা


গত তিন মাস ধরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক অভিনব নাগরিক আন্দোলন—‘ককরোচ পার্টি। নাম শুনে চমকে উঠলেও, এটি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়। বরং শহরের বস্তি, নিম্ন-আয়ের আবাসন ও অসংগঠিত শ্রমিকদের একাংশের প্রতীকী প্রতিবাদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই আন্দোলনটি পরিচিতি পেয়েছে।

১. আন্দোলনের পটভূমি: ককরোচ কেন?

আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, দিল্লির প্রান্তিক মানুষদের অবস্থা আরশোলার মতোসবাই তাদের ঘৃণা করে, উচ্ছেদ করতে চায়, অথচ তারাই সবচেয়ে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকে। গত এপ্রিলে দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন পরিচালিত এক উচ্ছেদ অভিযানে যমুনার পাড়ের ৩টি বস্তি ভাঙার পর থেকেই এই নামটি সামনে আসে।

উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দা মীনা দেবী বলেন, আমাদের আরশোলা বলে গালি দেয়। ঠিক আছে, আমরা আরশোলাই। মরব না, আবার ফিরে আসব। এই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে ককরোচ শব্দটিই প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়।

২. তিন দফা দাবি: আন্দোলনকারীরা কী চায়?

মাঠপর্যায়ে সংগঠকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের দাবিগুলোকে মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়:

দাবি

বিস্তারিত

রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান

১. উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন

আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বিকল্প আবাসন নিশ্চিত না করে কোনো বস্তি উচ্ছেদ নয়।

দিল্লি সরকার বলছে, ইন-সিটু পুনর্বাসন প্রকল্প চলমান, তবে জমির অভাবে গতি ধীর।

২. নগর পরিষেবায় অন্তর্ভুক্তি

বৈধ বিদ্যুৎ, পানির লাইন, রেশন কার্ড ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্তি। অবৈধ তকমা তুলে নেওয়া।

MCD-এর বক্তব্য, অবৈধ দখলদারদের পরিষেবা দিলে নতুন দখলে উৎসাহিত করা হবে।

৩. মর্যাদার স্বীকৃতি

পরিচ্ছন্নতা কর্মী, রিকশাচালক, গৃহকর্মীদের নগর নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃতি ও সামাজিক সুরক্ষা কার্ড।

কেন্দ্রের ই-শ্রম পোর্টাল আছে, কিন্তু আন্দোলনকারীরা বলছেন বাস্তবায়ন দুর্বল।

৩. আন্দোলনের কৌশল: কেন এটি আলাদা?

২৫ বছরের দক্ষিণ এশিয়া কভার করার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, এই আন্দোলনের তিনটি বৈশিষ্ট্য একে প্রচলিত প্রতিবাদ থেকে আলাদা করেছে:

১. প্রতীকের রাজনীতি: প্ল্যাকার্ডে মরা আরশোলা নয়, বরং স্টিলের গ্লাসে আঁকা আরশোলার ছবি। অর্থাৎ আমরা নোংরা নই, আমরা টিকে থাকা’—এই বার্তা।
২. অহিংস ও হাস্যরসাত্মক কর্মসূচি: রাস্তা অবরোধের বদলে আরশোলা মিছিল’—যেখানে অংশগ্রহণকারীরা মুখোশ পরে নিঃশব্দে হাঁটেন। পুলিশের সঙ্গে সংঘাত এড়ানোই উদ্দেশ্য।
৩. ডিজিটাল সংগঠন: কোনো একক নেতা নেই। ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ককরোচ ডায়েরিজ নামে অভিজ্ঞতা শেয়ার হয়। ফলে প্রচলিত নেতা ধরো, আন্দোলন থামাও কৌশল এখানে অকার্যকর।

৪. গঠনমূলক বিশ্লেষণ: সম্ভাবনা ও ঝুঁকি

সম্ভাবনার দিক দিল্লির মতো মেগাসিটিতে ৩০% মানুষ বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক আবাসনে থাকে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর নাগরিক পরিষেবা নিশ্চিত না করে স্মার্ট সিটি বা সুন্দর দিল্লি প্রকল্প টেকসই হবে না। ককরোচ পার্টির আন্দোলন নীতিনির্ধারকদের সেই বাস্তবতাটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের রিপোর্টেও বলা হয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক নগরায়ন ছাড়া ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.২% কমে যেতে পারে।

ঝুঁকির দিক

১. রাজনৈতিক ব্যবহার: ইতিমধ্যে দিল্লির প্রধান বিরোধী দলগুলো আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছে। আন্দোলন দলীয় ব্যানারে চলে গেলে মূল নাগরিক দাবি চাপা পড়তে পারে।
২. বৈধতা বিতর্ক: জমির মালিকানা ছাড়া পরিষেবা দিলে আইনি জটিলতা তৈরি হয়। সুপ্রিম কোর্টের অলমিত্র বনাম ইউনিয়ন মামলার রায় অনুযায়ী, জনস্বার্থে উচ্ছেদ বৈধ, তবে মানবিক পুনর্বাসন সাপেক্ষে।
৩. প্রতীকী ক্লান্তি: শুধু প্রতীক দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতি বদলানো কঠিন। সুনির্দিষ্ট খসড়া প্রস্তাব ও আইনি লড়াই ছাড়া আন্দোলন ফিকে হয়ে যেতে পারে।

৫. সামনের পথ: সংঘাত না সংলাপ?

দিল্লি স্কুল অফ ইকোনমিক্সের নগর-বিশেষজ্ঞ ড. রোহিণী শঙ্কর মনে করেন, সরকারের উচিত এটাকে আইন-শৃঙ্খলা ইস্যু না বানিয়ে নগর-পরিকল্পনা ইস্যু হিসেবে দেখা। তার প্রস্তাব তিনটি:

১. শহুরে সংলাপ কমিশন গঠন করে আন্দোলনকারী, MCD, DDA ও নাগরিক সমাজকে এক টেবিলে আনা।
২. ভাড়াভিত্তিক আবাসন মডেল চালু করা, যেখানে উচ্ছেদের বদলে স্বল্প ভাড়ায় একই স্থানে বহুতল ভবন করা হবে।
৩. ডেটা-ভিত্তিক ম্যাপিং: কত মানুষ, কোথায়, কী কাজ করেএই তথ্য ছাড়া কোনো নীতিই কাজ করবে না।

শেষ কথা

ককরোচ পার্টি দিল্লির রাজনীতিতে আসন পাবে কি না, সেটা গৌণ। কিন্তু তারা যে প্রশ্নটি তুলেছে—“শহর কার জন্য?”—সেই প্রশ্নের উত্তর না দিলে দিল্লি কেন, বিশ্বের কোনো মেগাসিটিই টেকসই হবে না। আন্দোলনটি সফল হলে তা হবে প্রতীকের জয়, ব্যর্থ হলে তা হবে নগর-পরিকল্পনার দৈন্যের প্রমাণ।

 

Comments

Popular posts from this blog

আর্জেন্টিনা ৩-১ জর্ডান: ফ্রি-কিকের জাদুতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দাপুটে জয়, মাথা উঁচু রেখেই বিদায় জর্ডানের

বাংলাদেশে সামাজিক অবক্ষয়: আমরা কোন পথে হাঁটছি?

🎯 গোলটা লো সেলসোর, কিন্তু মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এমি মার্তিনেজ! মাঠেই ফাঁস হলো আর্জেন্টিনার গোপন কৌশল!