ঢাকার জলাবদ্ধতা: প্রকৃতির অভিশাপ নয়, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের ফল

বিশেষ প্রতিবেদন | ঢাকা

প্রতিবার বর্ষা মৌসুম এলেই রাজধানী ঢাকা পরিণত হয় এক অচল নগরীতে। অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই প্রধান সড়ক, অলিগলি, আবাসিক এলাকা এবং ব্যবসায়িক কেন্দ্রগুলো পানির নিচে তলিয়ে যায়। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, যানজট, ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং নগরজীবনের স্থবিরতা যেন নিয়মিত এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী আলোচনায় এই জলাবদ্ধতার কারণ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সফল মডেল তুলে ধরে ঢাকার জন্য সম্ভাব্য সমাধানের পথ নির্দেশ করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং রাজনৈতিক উদাসীনতার ফল।

হারিয়ে গেছে খাল, সংকুচিত হয়েছে জলাধার

একসময় নদী ও খালনির্ভর শহর হিসেবে পরিচিত ছিল ঢাকা। শহরজুড়ে ছিল প্রায় ৬৫টি খাল, যা বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু নগরায়ণের চাপে এবং অবৈধ দখলের কারণে বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ২৬টি খাল।

গবেষণা অনুযায়ী, গত চার দশকেরও বেশি সময়ে ঢাকা তার ৬০ শতাংশের বেশি জলাধার হারিয়েছে। যে জলাধারগুলো একসময় প্রাকৃতিক রিজার্ভার হিসেবে কাজ করত, সেগুলোর অনেকগুলোই এখন বহুতল ভবন, আবাসন প্রকল্প কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনায় রূপান্তরিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি ধারণের প্রাকৃতিক সক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা চাপে পড়ে যাচ্ছে।

কংক্রিটের নগরীতে হারিয়ে গেছে পানির স্বাভাবিক পথ

১৯৮০ সালে ঢাকার মাত্র ৭ শতাংশ এলাকা কংক্রিটে আবৃত ছিল। বর্তমানে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশে।

এর অর্থ হলো, বৃষ্টির পানি মাটির ভেতরে প্রবেশ করার স্বাভাবিক সুযোগ ক্রমেই কমে গেছে। ফলে বৃষ্টির অধিকাংশ পানি সরাসরি সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষায়, ঢাকা এখন এমন এক "কংক্রিট নগরী" যেখানে পানি শোষণের চেয়ে পানি জমে থাকার প্রবণতা অনেক বেশি।

বক্স কালভার্ট: কোটি টাকার অবকাঠামো, কিন্তু কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত বক্স কালভার্টগুলো মূলত দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বছরের পর বছর রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, ময়লা-আবর্জনা ও পলিমাটি জমে থাকার কারণে অধিকাংশ কালভার্ট তাদের কার্যক্ষমতা হারিয়েছে।

বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক বক্স কালভার্ট বর্তমানে তাদের স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে।

ফলে পানি নিষ্কাশনের পরিবর্তে এগুলো অনেক ক্ষেত্রে জলাবদ্ধতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চার সংস্থা, এক সমস্যা: সমন্বয়হীনতার চক্রে ঢাকা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার অন্যতম বড় কারণ প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব।

বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন এবং রাজউকএই চারটি পৃথক সংস্থা বিভিন্ন অংশে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দায়িত্ব পালন করে।

কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় একটি ড্রেনের পানি অন্য ড্রেন, খাল বা জলাধারে পৌঁছানোর আগেই আটকে যায়। ফলে সামগ্রিক ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না।

নগর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই খণ্ডিত ব্যবস্থাপনা রাজধানীর জলাবদ্ধতা সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশ্বের সফল মডেল: শেখার আছে অনেক কিছু

টোকিওর ভূগর্ভস্থ জলাধার ব্যবস্থা

জাপানের রাজধানী টোকিও বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার একটি উদাহরণ।

সেখানে মাটির গভীরে বিশাল আকারের ভূগর্ভস্থ কূপ এবং সংযোগ টানেল নির্মাণ করা হয়েছে, যা অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত সংরক্ষণ ও অপসারণ করতে সক্ষম। এই ব্যবস্থা প্রতি সেকেন্ডে শত শত টন পানি সরিয়ে নিতে পারে।

কুয়ালালামপুরের স্মার্ট টানেল

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে নির্মিত "স্মার্ট টানেল" একই সঙ্গে সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

স্বাভাবিক সময়ে এটি যানবাহন চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হলেও ভারী বৃষ্টির সময় টানেলটি বন্যার পানি সরিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে একই অবকাঠামো দুই ধরনের সমস্যা সমাধান করছে।

সিঙ্গাপুরের খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্প

সিঙ্গাপুর কংক্রিটের ড্রেন ও নালাগুলোকে প্রাকৃতিক নদীতে রূপান্তর করেছে।

এর ফলে শুধু পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়নি, বরং নগরবাসীর জন্য সুন্দর পার্ক ও উন্মুক্ত সবুজ পরিবেশও তৈরি হয়েছে। পরিবেশবান্ধব এই উদ্যোগকে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সফল নগর জলব্যবস্থাপনা মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

রটারডামের ওয়াটার স্কয়ার

নেদারল্যান্ডসের রটারডামে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ ধরনের "ওয়াটার স্কয়ার" বা পানির চত্বর।

শুকনা মৌসুমে এগুলো খেলার মাঠ বা উন্মুক্ত জনসমাগমস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ভারী বৃষ্টির সময় এগুলো অস্থায়ী জলাধারে পরিণত হয়ে অতিরিক্ত পানি ধারণ করে।

ঢাকার জন্য দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান

বিশ্লেষকদের মতে, কোটি কোটি টাকার নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে বিদ্যমান অবকাঠামো সচল করাই সবচেয়ে জরুরি।

তাদের মতে, শিল্পকলা একাডেমি থেকে পল্টন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বক্স কালভার্ট পরিষ্কার করা গেলে প্রায় ১০ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হতে পারেন।

একই সঙ্গে গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার মাত্র ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার করা গেলে রাজধানীর প্রায় ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতা সমস্যা দূর করা সম্ভব।

বিশেষভাবে পান্থপথের নিচে থাকা কালভার্ট পরিষ্কার করা হলে ধানমন্ডি, কলাবাগান এবং আশপাশের এলাকায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি আসতে পারে।

টেকনিক্যাল সমাধানের পাশাপাশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কার

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র প্রকৌশলভিত্তিক সমাধান দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

প্রয়োজন একটি একক কর্তৃপক্ষ, যার কাছে পুরো নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থার দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা থাকবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর নগর পরিকল্পনা এবং জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে প্রশাসনিক সংস্কারও জরুরি।

তাদের মতে, নগর ব্যবস্থাপনায় মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া জলাবদ্ধতার মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে না।

উপসংহার

ঢাকার জলাবদ্ধতা আজ আর শুধুমাত্র একটি মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

যে শহর একসময় খাল ও জলাধারের মাধ্যমে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করত, সেই শহর আজ কংক্রিটের ভারে ন্যুব্জ। তবে বিশ্বের বিভিন্ন শহরের সফল অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ঢাকাও জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে পারে।

প্রশ্ন একটাইসমাধানের পথ জানা থাকার পরও সেই পথে হাঁটার সাহস ও সিদ্ধান্ত কি নেওয়া হবে?

 

Comments

Popular posts from this blog

আর্জেন্টিনা ৩-১ জর্ডান: ফ্রি-কিকের জাদুতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দাপুটে জয়, মাথা উঁচু রেখেই বিদায় জর্ডানের

বাংলাদেশে সামাজিক অবক্ষয়: আমরা কোন পথে হাঁটছি?

🎯 গোলটা লো সেলসোর, কিন্তু মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এমি মার্তিনেজ! মাঠেই ফাঁস হলো আর্জেন্টিনার গোপন কৌশল!