হরমুজ প্রণালী ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার; ইরান-ওমান আলোচনা ইতিবাচক অগ্রগতির দাবি, উত্তেজনা অব্যাহত মধ্যপ্রাচ্যে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে কূটনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা আরও জোরালো হয়েছে। ইরান জানিয়েছে, ওমানের সঙ্গে নিরাপদ সামুদ্রিক চলাচল নিশ্চিত করতে চলমান আলোচনা ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন করছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে একটি সমঝোতা খুব শিগগিরই চূড়ান্ত হতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘায়ি জানান, তেহরান ও মাসকাটের মধ্যে আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রবেশ ও প্রস্থানকারী জাহাজের জন্য নিরাপদ নৌপথ নির্ধারণ করা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচক ধারায় এগোচ্ছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা "আজ অথবা আগামীকালের মধ্যেই" সম্পন্ন হতে পারে। তাঁর মতে, সম্ভাব্য এই চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌযানগুলোর নিরাপদ ও স্বাধীন চলাচলের পথ আরও সুগম হবে।
তবে কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান Vanguard জানিয়েছে, ওমান উপকূলসংলগ্ন হরমুজ প্রণালীতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। ঘটনায় অন্তত একজন নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন। হামলার প্রকৃতি কিংবা এর পেছনে কারা দায়ী—সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
এদিকে, লেবানন ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি আলোচনার সপ্তম দফা বৈঠক ইতালির রাজধানী রোমে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে এই আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে পুনরায় কার্যকর করা তথাকথিত "ইরান অবরোধ" কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তারা মোট ৪৫টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। আগের দিনের তুলনায় এই সংখ্যা একটি বেশি।
যদিও CENTCOM দাবি করছে, হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌযানের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে, তবুও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। নিরাপদ নৌপরিবহন নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা এবং আরব উপদ্বীপ বিষয়ক সাবেক পরিচালক ডেভিড ডেস রোচেস মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হতে পারে, কারণ ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তাঁর মতে, ইরানের ভেতরে ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্র সক্রিয় থাকায়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে হওয়া কোনো সমঝোতা পরবর্তীতে কঠোরপন্থী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ফলে কূটনৈতিক সমাধান অর্জন হলেও তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ডেস রোচেস আরও বলেন, সম্ভাব্য সমঝোতার একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো হতে পারে—ইরান তার নিজস্ব আঞ্চলিক জলসীমায় কিছু নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে, তবে ওমানের সার্বভৌম জলসীমা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করবে না।
গাজায় অবস্থান পরিবর্তনে অনড় ইসরায়েল
এদিকে গাজা পরিস্থিতি নিয়েও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী গাজার বর্তমান অবস্থান থেকে সরে যাবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসনও হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ ও গাজাকে সামরিকমুক্ত করার ধারণাকে সমর্থন করছে।
নেতানিয়াহু আরও জানান, একটি খসড়া প্রস্তাব ইসরায়েলের কাছে পৌঁছেছিল, তবে সেটি তাদের গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েল নিজস্ব সংশোধিত প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে পাঠিয়েছে এবং বিষয়টি গণমাধ্যমে আলোচনায় আসার আগেই সেই প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
সারসংক্ষেপ
হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে কূটনৈতিক উদ্যোগ, সামরিক উপস্থিতি এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একদিকে ইরান ও ওমান নিরাপদ নৌপরিবহন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চলাচল অব্যাহত রাখতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে গাজা ও লেবানন-ইসরায়েল ইস্যুতেও চলমান উত্তেজনা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে জটিল করে তুলছে। ফলে আগামী কয়েক দিন মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

Comments
Post a Comment