জর্ডানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি: আল আজরাক ঘাঁটিসহ মার্কিন স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা: ইরান বলছে ‘প্রতিশোধমূলক হামলা’, জর্ডান দাবি করছে ৮ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা জর্ডানের ভূখণ্ডে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আল আজরাক বিমানঘাঁটিসহ মোট ১০টি মার্কিন স্থাপনা ছিল বলে দাবি করেছে তেহরান।
ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই হামলা ছিল তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত কথিত “বিশ্বাসঘাতকতা ও আগ্রাসনের” জবাব। আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, জর্ডানের সামরিক অবকাঠামোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এর আগে কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের সামরিক এলাকাকে ঘিরে উত্তেজনার পর এবার জর্ডানও এই সংঘাতের প্রভাবের মুখে পড়েছে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, রাতের আকাশে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
আইআরজিসির দাবি: ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ
ইরানের সামরিক বাহিনী আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা পরিকল্পিত অভিযানের অংশ হিসেবে জর্ডানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই অঞ্চলে আবারও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত কোনো মার্কিন ঘাঁটি নিরাপদ থাকবে না।
ইরানের সামরিক নেতৃত্ব আরও সতর্ক করে জানিয়েছে, ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আরও বড় পরিসরের এবং শক্তিশালী হামলা চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
জর্ডানের পাল্টা দাবি: আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ৮ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস
তবে জর্ডানের সামরিক বাহিনী ইরানের দাবির বিপরীতে জানিয়েছে, দেশটির শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত সক্রিয় হয়ে আকাশেই বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে।
জর্ডানের সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ইরান থেকে নিক্ষেপ করা ৮টি ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে। কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পড়ে থাকলেও এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
জর্ডান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও আকাশসীমা রক্ষায় তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কোনো পক্ষের সামরিক কার্যক্রমের জন্য জর্ডানের ভূখণ্ড ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও তারা জানিয়েছে।
আল আজরাক বিমানঘাঁটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জর্ডানের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আল আজরাক বিমানঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই ঘাঁটির কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, বেলজিয়াম ও ফ্রান্সের সামরিক বাহিনী ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী অভিযানে এই ঘাঁটি ব্যবহার করেছে।
যদিও জর্ডান আনুষ্ঠানিকভাবে বলে আসছে যে তাদের ভূখণ্ডে কোনো স্থায়ী বিদেশি সামরিক ঘাঁটি নেই, তবে বিভিন্ন সামরিক সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় সীমিত সংখ্যক বিদেশি সেনা দেশটিতে অবস্থান করে।
বিশ্লেষণ: নতুন সংঘাতের ঝুঁকিতে মধ্যপ্রাচ্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, জর্ডানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। জর্ডান ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও একই সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা যদি আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে এর প্রভাব শুধু জর্ডান নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই হামলা কি সীমিত সামরিক প্রতিক্রিয়ায় শেষ হবে, নাকি এটি মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় ধরনের সংঘাতের সূচনা করবে।
(আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিশেষ প্রতিবেদন)

Comments
Post a Comment