একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য অর্থ উত্তোলনের সুযোগ বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক

চিকিৎসার পাশাপাশি পারিবারিক ও অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনেও সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা উত্তোলনের অনুমতি; আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়ায় নতুন সংশোধনী

ঢাকা, বাংলাদেশ | ২৯ জুলাই 

একীভূত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য অর্থ উত্তোলনের সুযোগ আরও বিস্তৃত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে গ্রাহকরা শুধু নিজেদের চিকিৎসার জন্য নয়, বরং পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনেও সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।

বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় সংশোধিত আমানত ফেরত প্রদানের পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।

নতুন সুবিধার আওতায় আসছেফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহকরা। এই পাঁচটি ব্যাংককে সম্প্রতি একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংকিং কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, আগের ব্যবস্থায় গ্রাহকরা মূলত নিজেদের চিকিৎসার প্রয়োজনেই সীমিত পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পেতেন। তবে সংশোধিত নীতিমালায় সেই সীমা ও ব্যবহারের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এখন থেকে বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান এবং ভাই-বোনের চিকিৎসা ব্যয় ছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক প্রয়োজনে অর্থ উত্তোলনের আবেদন করা যাবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। অনেক আমানতকারী চিকিৎসার পাশাপাশি মেয়ের বিয়ে, পরিবারের সদস্যদের জরুরি চিকিৎসা বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনের জন্য অর্থের সংকটে পড়ছিলেন। নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের কিছুটা আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

আর্থিক সংকট থেকে পুনর্গঠনের পথে পাঁচ ব্যাংক

একীভূত পাঁচটি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে তারল্য সংকট, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং অনিয়মিত ঋণ বিতরণের কারণে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়ে। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত জামানত ও ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়াই বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণের ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অনেক আমানতকারী সময়মতো তাদের অর্থ ফেরত পেতে সমস্যায় পড়েন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার শরিয়াহভিত্তিক এই পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেয়। এর লক্ষ্য ছিল ব্যাংকিং কার্যক্রমকে স্থিতিশীল করা, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া।

নতুন ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন সহায়তা দিয়েছে। অবশিষ্ট ১৫ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া আমানতকারীদের স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সহায়তা দিতে আমানত বীমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই তহবিল থেকে বর্তমানে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। অবশিষ্ট অর্থ পর্যায়ক্রমে পরিশোধের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

৮ লাখের বেশি আমানতকারী পেয়েছেন অর্থ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখ ২২ হাজার আমানতকারীকে মোট ৩ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহককে দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আমানত ফেরত দেওয়ার এই প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে চলবে এবং সংশোধিত নীতিমালার মাধ্যমে প্রকৃত প্রয়োজন থাকা গ্রাহকদের জন্য অর্থ ব্যবহারের সুযোগ আরও সহজ করা হয়েছে।

ঋণ সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ

তবে একীভূত ব্যাংকগুলোর আর্থিক পুনরুদ্ধার এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।

এর বিপরীতে জামানতের পরিমাণ মাত্র ৪৭ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। একই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চাপ কমাতে নতুন উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে খেলাপি ঋণ আদায়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং কার্যকর পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।

একীভূত পাঁচ ব্যাংকের পুনর্গঠন কার্যক্রম এখন দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই হবে নতুন ব্যবস্থার মূল সাফল্যের মানদণ্ড।

Comments

Popular posts from this blog

আর্জেন্টিনা ৩-১ জর্ডান: ফ্রি-কিকের জাদুতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দাপুটে জয়, মাথা উঁচু রেখেই বিদায় জর্ডানের

বাংলাদেশে সামাজিক অবক্ষয়: আমরা কোন পথে হাঁটছি?

🎯 গোলটা লো সেলসোর, কিন্তু মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এমি মার্তিনেজ! মাঠেই ফাঁস হলো আর্জেন্টিনার গোপন কৌশল!