স্বামী ডিভোর্স দিতে না চাইলে স্ত্রী কীভাবে আইনগতভাবে ডিভোর্স নিতে পারেন? — বাংলাদেশ আইন অনুযায়ী বিস্তারিত পরামর্শ
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে জানা দরকার—বাংলাদেশের আইনে স্বামী ডিভোর্স দিতে না চাইলেও একজন স্ত্রী নির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটাতে পারেন। অর্থাৎ, একজন নারীর জীবনকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখার অধিকার কারও নেই।
যদি আপনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক, শারীরিক, অর্থনৈতিক বা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন এবং সংসার টিকিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পরও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব না হয়, তাহলে আইনের আশ্রয় নেওয়া আপনার বৈধ অধিকার।
১. স্ত্রী কি নিজে ডিভোর্স দিতে পারেন?
হ্যাঁ, পারেন।
তবে এটি নির্ভর করবে আপনার কাবিননামায় (নিকাহনামা) "তালাক-ই-তাফওয়ীজ" (Delegated Divorce) ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে কি না তার ওপর।
যদি কাবিননামায় তালাকের ক্ষমতা দেওয়া থাকে
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961)-এর অধীনে স্ত্রী নিজেই তালাক কার্যকর করতে পারবেন।
এক্ষেত্রে—
- নির্ধারিত ফরমে তালাকের নোটিশ প্রস্তুত করতে হবে।
- স্বামীর ঠিকানায় নোটিশ পাঠাতে হবে।
- সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা/ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট কপি জমা দিতে হবে।
- নোটিশ প্রাপ্তির পর ৯০ দিন অতিক্রান্ত হলে তালাক কার্যকর হবে।
২. কাবিননামায় তালাকের ক্ষমতা না থাকলে কী করবেন?
এক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করতে হবে।
প্রযোজ্য আইন:
Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939
এই আইনের ধারা ২ অনুযায়ী স্ত্রী নিম্নলিখিত কারণে আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন—
(ক) স্বামীর নির্যাতন
- শারীরিক নির্যাতন
- মানসিক নির্যাতন
- অপমানজনক আচরণ
- অবহেলা
(খ) ভরণপোষণ না দেওয়া
স্বামী দুই বছর বা তার বেশি সময় স্ত্রীকে ভরণপোষণ না দিলে।
(গ) স্বামীর নিষ্ঠুর আচরণ
- মারধর করা
- গালিগালাজ
- জোরপূর্বক অনৈতিক কাজে বাধ্য করা
- অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়া
(ঘ) বৈবাহিক দায়িত্ব পালন না করা
যৌক্তিক কারণ ছাড়া তিন বছর বা তার বেশি সময় স্বামী বৈবাহিক দায়িত্ব পালন না করলে।
(ঙ) অন্যান্য বৈধ কারণ
আদালত পরিস্থিতি বিবেচনা করে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
৩. দেনমোহর (কাবিনের টাকা) কীভাবে আদায় করবেন?
দেনমোহর স্ত্রীর আইনগত ও সম্পূর্ণ প্রাপ্য অধিকার।
স্বামী ডিভোর্স দিক বা না দিক, দেনমোহর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বহাল থাকে।
করণীয়
- পারিবারিক আদালতে (Family Court) দেনমোহর আদায়ের মামলা করতে হবে।
- কাবিননামা, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বিবাহের প্রমাণপত্র সংযুক্ত করতে হবে।
- আদালত দেনমোহর আদায়ের ডিক্রি প্রদান করতে পারেন।
- প্রয়োজনে স্বামীর সম্পত্তি জব্দ করে দেনমোহর আদায় করা যেতে পারে।
৪. ভরণপোষণ (Maintenance) পাওয়ার অধিকার
বাংলাদেশের পারিবারিক আইন অনুযায়ী স্ত্রী নিম্নলিখিত দাবি করতে পারেন—
- বকেয়া ভরণপোষণ
- ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ
- সন্তান থাকলে সন্তানের ভরণপোষণ
- চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়
প্রতিটি বিষয় পৃথকভাবে আদালতে দাবি করা যায়।
৫. স্বামী যদি হুমকি দেয় বা নির্যাতন করে?
তাহলে অবিলম্বে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
প্রযোজ্য আইন
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০
এছাড়া
Domestic Violence (Prevention and Protection) Act, 2010
এর অধীনে—
- Protection Order
- Residence Order
- Compensation Order
- নিরাপত্তামূলক নির্দেশনা
পাওয়া যেতে পারে।
৬. মামলা করার আগে কী কী কাগজপত্র সংগ্রহ করবেন?
- কাবিননামার কপি
- জাতীয় পরিচয়পত্র
- স্বামীর নাম ও ঠিকানা
- নির্যাতনের প্রমাণ (যদি থাকে)
- চিকিৎসার কাগজপত্র
- ছবি, অডিও, ভিডিও, মেসেজ
- সাক্ষীর তথ্য
এসব দলিল ভবিষ্যতে মামলাকে শক্তিশালী করবে।
৭. বাস্তবিক করণীয় (Step-by-Step)
প্রথম ধাপ:
কাবিননামার ১৮
নম্বর কলামে তালাকের ক্ষমতা (তাফওয়ীজ) আছে কি না যাচাই করুন।
দ্বিতীয় ধাপ:
একজন পারিবারিক
আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করুন।
তৃতীয় ধাপ:
প্রয়োজন হলে
- বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা,
- দেনমোহর মামলা,
- ভরণপোষণ মামলা
একসঙ্গে বা পৃথকভাবে দায়ের করুন।
চতুর্থ ধাপ:
সব ধরনের
যোগাযোগ ও নির্যাতনের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
গুরুত্বপূর্ণ কথা
আপনি যদি দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে না পারেন, এবং আপনার সম্মান, নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে আইন আপনাকে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ দিয়েছে। স্বামী ডিভোর্স দিতে না চাইলেও আদালতের মাধ্যমে বৈধভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ, দেনমোহর আদায়, ভরণপোষণ এবং অন্যান্য আইনগত অধিকার আদায় করা সম্ভব।
সঠিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য একজন অভিজ্ঞ পারিবারিক আইনজীবীর সঙ্গে সরাসরি পরামর্শ করা উত্তম। কাবিননামার শর্ত, দেনমোহরের পরিমাণ, সন্তান আছে কি না, এবং নির্যাতনের প্রকৃতি অনুযায়ী কৌশল কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
Comments
Post a Comment