জুলাই বিপ্লবের প্রথম নারী শহীদ নাঈমা সুলতানা: স্বপ্নভঙ্গের এক বেদনাময় ইতিহাস
“আম্মু, আমি শহীদ হলে তুমি কান্না করিও না। শুধু আলহামদুলিল্লাহ বলিও।”
শাহাদাতের মাত্র একদিন আগে মায়ের কাছে এই কথাগুলো বলেছিল কিশোরী নাঈমা সুলতানা। কে জানত, সেই কথাই এত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেবে! ২০২৪ সালের জুলাইয়ের উত্তাল আন্দোলনের দিনগুলোতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নেওয়া এই সাহসী কিশোরী পরিণত হন জুলাই বিপ্লবের প্রথম নারী শহীদে।
২০০৯ সালের ২৫ জুলাই জন্মগ্রহণ করা নাঈমা সুলতানার জন্মদিন আজ। অথচ জন্মদিনের আনন্দের পরিবর্তে পরিবার, সহপাঠী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের হৃদয়ে ফিরে আসে এক গভীর বেদনা ও শূন্যতার অনুভূতি।
আন্দোলনের অগ্রসেনানী থেকে শহীদ
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরায় নিজ বাসার বারান্দায় শুকনো কাপড় আনতে গেলে একটি গুলি তার মাথায় বিদ্ধ হয়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করে মাত্র ১৫ বছর বয়সী এই কিশোরী।
মৃত্যুকালে নাঈমা ছিলেন উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে সেই স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়।
শাহাদাতের আগের দিনও সহপাঠীদের সঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেলের সামনে সোনারগাঁ জনপথে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল নাঈমা। বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়ে সে নিয়মিত আন্দোলনে যুক্ত ছিল। শুধু তাই নয়, বন্ধুদেরও আন্দোলনে অংশ নিতে উৎসাহিত করত।
রংতুলিতে আন্দোলনের ভাষা
নাঈমা শুধু একজন আন্দোলনকর্মীই ছিল না, ছিল একজন প্রতিভাবান অঙ্কনশিল্পীও। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রংতুলিতে আঁকেছে স্বপ্ন, প্রতিবাদ ও মুক্তির গল্প।
উত্তরার বিভিন্ন দেয়ালে আজও তার আঁকা গ্রাফিতিগুলো আন্দোলনের স্মৃতি বহন করছে। নিজের ডায়েরিতে আঁকা পোস্টারে সে লিখেছিল—
“চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার”
এবং
“তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা”
এসব স্লোগান।
নিজের ফেসবুক ওয়ালে একটি পোস্টার প্রকাশ করে সে লিখেছিল—
“আন্দোলন হবে এবার রংতুলিতে। কোটা প্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক।”
শিল্প, মেধা ও দেশপ্রেম—এই তিনের অপূর্ব সমন্বয় ছিল তার ব্যক্তিত্বে।
পাঠ্যপুস্তকে নাঈমার নাম অন্তর্ভুক্তির দাবি
শহীদ জননী আইনুন নাহার সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন, জুলাই বিপ্লবের প্রথম নারী শহীদ হিসেবে নাঈমা সুলতানার নাম জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
তিনি বলেন,
“আমার মেয়ে নাঈমা জুলাই বিপ্লবের প্রথম নারী শহীদ। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই, প্রথম নারী শহীদ হিসেবে তার নাম যেন পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, নাঈমা ছিল আন্দোলনের অগ্রসেনানী। ছাত্রদের অধিকার আদায় এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের স্বপ্নে সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল তার জীবনের অংশ।
স্মৃতির ঘরে আজও নাঈমা
নাঈমার বাবা, হোমিও চিকিৎসক গোলাম মোস্তফা, মেয়ের স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
তিনি বলেন,
“দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে নাঈমা ছিল মেজো। সে ছিল আমার সবচেয়ে মেধাবী সন্তান। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখত। কিন্তু দেশের আন্দোলনে প্রথম নারী শহীদদের একজন হিসেবে নিজের জীবন উৎসর্গ করে গেল।”
আজও তাদের বাসার ড্রইংরুম এবং নাঈমার ব্যক্তিগত কক্ষে বিজ্ঞান বিভাগের বই, খাতা ও গাইডগুলো পরিপাটি করে সাজানো রয়েছে। ঘরের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে আছে তার স্মৃতি। সবকিছু আগের মতোই আছে, শুধু নেই নাঈমা।
২০২৪ সালের ২০ জুলাই তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার আমুয়াকান্দির দেওয়ান বাড়ি কবরস্থানে দাফন করা হয়।
কেমন আছে নাঈমার পরিবার?
নাঈমারা ছিলেন দুই বোন ও এক ভাই। জন্মের পর সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল বড় বোন তাসফিয়া। কারণ দীর্ঘদিন পর সে পেয়েছিল একজন খেলার সঙ্গী, একজন বন্ধু।
আজ সেই বন্ধুহীন জীবন তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
তাসফিয়া বলেন,
“নাঈমা আমার ছোট বোন হলেও সে ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আমাদের খুনসুটি লেগেই থাকত। একসঙ্গে ঘুরতে যেতাম, গল্প করতাম। এখন সবকিছুতেই তাকে মিস করি। আমাদের জীবনে এখন শুধুই শূন্যতা। কেন আমার বোনকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হলো—এর বিচার আমি আল্লাহর কাছে দিলাম।”
অন্যদিকে, নাঈমার একমাত্র ভাই আব্দুর রহমানের বয়স এখন ৯ বছর। বোনের রক্তমাখা কফিনের দৃশ্য আজও তাকে তাড়া করে ফেরে। তার মধ্যে এখনও ভয় ও আতঙ্ক কাজ করে। যে বোন তাকে সবচেয়ে বেশি আদর করত, তাকে হারানোর কষ্ট সে এখনো ভুলতে পারেনি। মাঝেমধ্যেই মায়ের সঙ্গে বসে কাঁদে সে।
ক্লাসরুমে নেই নাঈমা
নাঈমা এখন আর স্কুলে যায় না। আর কোনোদিন তাকে দেখা যাবে না ক্লাসরুমে, অ্যাসেম্বলিতে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে করিডোরে।
প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসে তার প্রাণবন্ত উপস্থিতি, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আড্ডা, কিংবা রংতুলিতে আঁকা প্রতিবাদের ভাষা—সবই এখন স্মৃতি।
সহপাঠীদের চোখেমুখে আজও ভাসে প্রিয় বন্ধুকে হারানোর কষ্ট। অল্প কিছুদিন আগেও যে মেয়েটি তাদের পাশে বসে পড়াশোনা করত, স্বপ্ন দেখত এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করত, আজ সে নেই।
কিন্তু তার স্বপ্ন, তার সাহস, তার প্রতিবাদ এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা এখনও বেঁচে আছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে।
মাত্র ১৫ বছরের জীবনে নাঈমা সুলতানা যে সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। জন্মদিনে তার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং দোয়া।

Comments
Post a Comment