‘প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি, বিদ্যুৎ সংকটের সমাধানও প্রস্তাব করছি’: হাসনাত আবদুল্লাহ

ঢাকা —

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলকে ছয় মাসের মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান পরিকল্পনা দেওয়ার যে চ্যালেঞ্জ প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তা গ্রহণ করার কথা জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।

শনিবার রাতে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, সরকার চ্যালেঞ্জ দেওয়ার আগেই বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একাধিক সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এখন সেগুলো বিবেচনা করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া সরকারের দায়িত্ব।

হাসনাতের দাবি, বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে এনসিপির পক্ষ থেকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাসহ মোট ১৫টি প্রস্তাব ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধী দলের অন্যান্য সদস্য, নাগরিক সমাজ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকেও সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন সুপারিশ এসেছে।

‘সমাধানের প্রস্তাব আগেই দেওয়া হয়েছে’

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে ছয় মাসের সময়সীমা দিয়ে চ্যালেঞ্জ জানানোর আগে জানা উচিত ছিল যে বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে ইতোমধ্যেই একাধিক প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে।

তার দাবি, এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম স্বল্পমেয়াদে ৩০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য পাঁচটি, মধ্যমেয়াদে ৬ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য ছয়টি এবং দীর্ঘমেয়াদে আরও চারটি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন।

হাসনাতের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি, জ্বালানি সরবরাহ, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও কর্মকর্তাদের বড় একটি দল থাকা সত্ত্বেও এসব প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছায়নি বা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি কেন।

সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

নিজের পোস্টে হাসনাত সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

তার দাবি, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীসহ সরকারের নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করলেও নাগরিক সমাজ কিংবা বিরোধী দলের প্রস্তাবগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হয়নি।

তার মতে, বিষয়টি এখন শুধু বিদ্যুৎ নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সরকারের সংশ্লিষ্ট টিমের দক্ষতা, কার্যকারিতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তিনি প্রধানমন্ত্রীকে এনসিপির দেওয়া ১৫ দফা প্রস্তাব পর্যালোচনার আহ্বান জানান।

বিশেষ সংসদীয় অধিবেশনের দাবি

বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সংসদীয় অধিবেশন আহ্বানের অনুরোধ জানানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন হাসনাত।

তার মতে, জাতীয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংসদীয় আলোচনার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

সরকার এ ধরনের প্রস্তাবকে যথাযথ গুরুত্ব না দিলে তা হতাশাজনক এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

‘প্রশাসনে দলীয় পদায়নে অভিজ্ঞতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে’

বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও অভিজ্ঞতার ঘাটতিকেও দায়ী করেছেন হাসনাত।

তার অভিযোগ, গত ছয় মাসে প্রশাসনে ব্যাপক দলীয় পদায়নের ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর প্রভাব হিসেবে তিনি জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে কি না, তা তার বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি।

মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা FSRU-সংক্রান্ত একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও তুলে ধরে হাসনাত স্বাধীন তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ঘটনাটি অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণজনিত ত্রুটি নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে—তা পরিষ্কার করার জন্য স্বচ্ছ তদন্তের প্রয়োজন বলে তিনি দাবি করেন।

মার্চেন্ট পাওয়ার নীতি বাস্তবায়নের দাবি

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সমাধানে হাসনাতের অন্যতম প্রধান প্রস্তাব হলো Merchant Power Policy 2025 বাস্তবায়ন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই কাঠামোর মাধ্যমে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকরা সরাসরি বড় শিল্প গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবেন। উৎপাদক ও গ্রাহক পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ করবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রয়োজনীয় তদারকি করবে।

হাসনাতের দাবি, এ ধরনের ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর সরাসরি অতিরিক্ত চাপ না দিয়েও শিল্পখাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, এ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় চুক্তি কাঠামো এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন বা wheeling charge-সংক্রান্ত বিষয় দ্রুত চূড়ান্ত করা সম্ভব।

‘ছয় মাসের ঘড়ি সরকারের’

হাসনাত বলেন, প্রধানমন্ত্রী যখন ছয় মাসের সময়সীমা দিয়েছেন, বিরোধী দল সেই সময়সীমা মেনে নিতে প্রস্তুত।

তবে তার যুক্তি, সময় গণনা হবে সরকারের জন্যই।

তার বক্তব্য হলো, প্রস্তাবিত নীতিগুলো বাস্তবায়নে যদি ছয় মাসের বেশি সময় লাগে, তাহলে সেটিকে শুধু নীতিগত বিলম্ব হিসেবে দেখার সুযোগ থাকবে না; বরং তা সরকারের প্রশাসনিক ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পনা থাকা মানেই শুধু ঘোষণা দেওয়া নয়—সেই পরিকল্পনা বাস্তবে কার্যকর করার সক্ষমতাও থাকতে হবে।

‘প্রধানমন্ত্রীর উচিত সরকারের জবাবদিহি করা’

হাসনাত আরও বলেন, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারকে বিরোধী দলকে চ্যালেঞ্জ দেওয়ার পাশাপাশি নিজের কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহিও করতে হয়।

তার মতে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—সরকার ছয় মাস ধরে ক্ষমতায় থাকার পরও কেন দেশে ব্যাপক লোডশেডিং দেখা দিয়েছে এবং কেন বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি এতটা সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তিনি প্রশ্ন করেন, “রাষ্ট্র কেন অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো?”

‘সমাধান আমাদের হাতে, ক্ষমতা সরকারের হাতে’

নিজের বক্তব্যের শেষদিকে হাসনাত বলেন, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের হাতে পরিকল্পনা রয়েছে, কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সরকারের হাতে।

তার ভাষায়, ছয় মাস পর জনগণই মূল্যায়ন করবে—বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে আসলে সমাধানের অভাব ছিল, নাকি সেই সমাধান বাস্তবায়নের সক্ষমতার ঘাটতি ছিল।

রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ থেকে এখন বাস্তবায়নের প্রশ্ন

হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যে মূলত দুটি বিষয় সামনে এসেছে—বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের প্রস্তাব বাস্তবায়নের দাবি এবং সরকারের জবাবদিহির প্রশ্ন।

সরকারের পক্ষ থেকে এই দাবিগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এলে বিতর্কটি আরও স্পষ্ট হবে। তবে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে এখন বড় প্রশ্ন হলো—দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কোন পরিকল্পনা বাস্তবে কার্যকর করা হচ্ছে এবং তার ফল জনগণ কত দ্রুত দেখতে পাচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এখন নজর থাকবে—পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের পথে সরকার কত দ্রুত এগোয়।

Comments

Popular posts from this blog

আর্জেন্টিনা ৩-১ জর্ডান: ফ্রি-কিকের জাদুতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দাপুটে জয়, মাথা উঁচু রেখেই বিদায় জর্ডানের

বাংলাদেশে সামাজিক অবক্ষয়: আমরা কোন পথে হাঁটছি?

🎯 গোলটা লো সেলসোর, কিন্তু মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এমি মার্তিনেজ! মাঠেই ফাঁস হলো আর্জেন্টিনার গোপন কৌশল!