চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতাল: অব্যবহৃত অবকাঠামো থেকে জনসেবার বিস্তৃতি

নিজস্ব প্রতিবেদন

চট্টগ্রামের একটি রেলওয়ে হাসপাতাল একসময় ছিল বড় অবকাঠামো, সীমিত রোগী এবং তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মীর সমন্বয়ে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। পরে হাসপাতালটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে সেখানে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসাসেবা পেতে শুরু করেন।

এই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফাওজুল কবির খান

তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় একবার চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে তিনি রেলওয়ে হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। সেখানে বড় পরিসরের অবকাঠামো থাকলেও রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র তিনজন। চিকিৎসক, নার্স, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীসহ কর্মরত ছিলেন প্রায় ২০ জন।

হাসপাতালে কিছু আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামও ছিল। তবে সেবার পরিধি মূলত রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

অন্যদিকে, একই শহরের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের জায়গার সংকট এতটাই প্রকট ছিল যে অনেককে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছিল।

এই বৈপরীত্যের কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন ফাওজুল কবির খান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মকর্তারা তাঁকে জানান—রেলওয়ে হাসপাতালটিতে চিকিৎসক ও নার্সের সংকট রয়েছে এবং পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থাও নেই। এসব কারণে সেখানে রোগী আসছিল না।

পরিস্থিতি বিবেচনায় হাসপাতালটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত রাখা হলে এ ধরনের উদ্যোগে তাঁদের আপত্তি নেই।

পানি সংকটেও থেমে ছিল সেবা

হাসপাতালের অন্যতম বড় সমস্যা ছিল নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ।

ফাওজুল কবির খানের বক্তব্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ওয়াসার কাছে পানি সংযোগের জন্য আবেদন করা হলেও দীর্ঘদিন কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। শুধু হাসপাতাল নয়, চট্টগ্রাম রেলস্টেশন ও সিআরবিতেও পানি সরবরাহের সমস্যা ছিল।

ঢাকায় ফিরে তিনি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল—রেলওয়ের হাসপাতালগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা।

তিনি জানান, এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর রেল সচিব ফাহিমের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর দাবি, প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

পাশাপাশি চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও তিনি তৎকালীন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের কাছে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং নির্ধারিত অর্থ জমা দেওয়ার পর প্রায় এক মাসের মধ্যে চট্টগ্রাম রেলস্টেশন, রেলওয়ে হাসপাতাল ও সিআরবিতে ওয়াসার পানি সরবরাহ শুরু হয়।

তিন রোগী থেকে প্রায় ৩০০

ফাওজুল কবির খান বলেন, সম্প্রতি পূর্বাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক তাঁকে ফোন করে হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানান।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালটিতে এখন প্রায় ৩০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন এবং প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ভালোভাবে চলছে। একই সঙ্গে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন।

তাঁর মতে, একটি বিদ্যমান সরকারি অবকাঠামোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার ফলে একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ এবং রেলওয়ের নিজস্ব কর্মীরাও উপকৃত হয়েছেন।

ছোট উদ্যোগেও দৃশ্যমান পরিবর্তন

রেলওয়ের সেবাব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরেকটি ছোট উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেছেন সাবেক এই উপদেষ্টা।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের সহযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন রেলস্টেশন ও সিআরবি এলাকায় বড় আকারের ডাস্টবিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পূর্বাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপকের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, এর ফলে স্টেশনগুলোর পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

তবে দায়িত্ব পালনের সময় রেলওয়ের বড় সমস্যাগুলোর একটি—ইঞ্জিন ও বগির সংকট—সমাধানের উদ্যোগ শুরু করলেও সময়ের অভাবে তা শেষ করে যেতে পারেননি বলে জানান তিনি।

‘ছোট কাজও মানুষের উপকারে আসে’

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ফাওজুল কবির খান বলেন, বড় প্রকল্পের পাশাপাশি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ছোট ছোট উদ্যোগও মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।

তাঁর মতে, দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা চাইলে বিদ্যমান সম্পদ ও অবকাঠামোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করে জনসেবার পরিধি বাড়াতে পারেন।

তিনি বলেন, তাঁর দায়িত্বকালে নেওয়া উদ্যোগগুলোর সবগুলো শেষ করা সম্ভব না হলেও যেসব ছোট পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়েছে, সেগুলো মানুষের উপকারে আসছে—এটি তাঁর জন্য সন্তুষ্টির বিষয়।

মোহাম্মদ ফাওজুল কবির খান
সাবেক উপদেষ্টা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়

প্রতিবেদনের মূল বার্তা

চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতালের অভিজ্ঞতা দেখায়, বিদ্যমান সরকারি অবকাঠামো যথাযথ ব্যবস্থাপনা, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় জনবল ও সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে কীভাবে আরও বেশি মানুষের জন্য ব্যবহারযোগ্য করা যেতে পারে। একই সঙ্গে এই ঘটনাটি সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, জনসেবা সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।

Comments

Popular posts from this blog

আর্জেন্টিনা ৩-১ জর্ডান: ফ্রি-কিকের জাদুতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দাপুটে জয়, মাথা উঁচু রেখেই বিদায় জর্ডানের

বাংলাদেশে সামাজিক অবক্ষয়: আমরা কোন পথে হাঁটছি?

🎯 গোলটা লো সেলসোর, কিন্তু মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এমি মার্তিনেজ! মাঠেই ফাঁস হলো আর্জেন্টিনার গোপন কৌশল!