আদালতে ঢুকে ওসির তিন স্যালুট, বিচারকের জবাব—‘অর্ডার অর্ডারই’
ফেনী:
বুধবার (১২ আগস্ট) ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ এন এম মোরশেদ খানের এজলাসে এ ঘটনা ঘটে বলে আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, বিচারক এজলাসে ওঠার আগে ওসি নোমান তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। তবে আদালতের সংশ্লিষ্টরা অনুমতি ছাড়া বিচারকের সঙ্গে দেখা করা যাবে না বলে তাঁকে জানান।
পরে বিচারক এজলাসে ওঠার পর ওসি নোমান সেখানে প্রবেশ করেন এবং তিনবার স্যালুট দিয়ে বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন।
বিষয়টি নজরে এলে বিচারক আদালতের স্টেনোগ্রাফারের কাছে ওই কর্মকর্তার পরিচয় জানতে চান। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিচারক ওসি নোমানকে উদ্দেশ করে বলেন, তাঁর সঙ্গে বিচারকের ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক নেই এবং ইতোমধ্যে তাঁকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময় বিচারক বলেন, ‘অর্ডার অর্ডারই।’
এরপর ওসি নোমান এজলাস থেকে বেরিয়ে যান।
যে আদেশের পর ওসিকে প্রত্যাহার
ওসি নোমানের আদালতে প্রবেশের ঘটনাটি ঘটে ৯ আগস্ট দেওয়া একটি আদালতের আদেশের কয়েকদিন পর।
ওই আদেশে দাগনভূঞার মমারিজপুর এলাকার বিবি মারজাহান (২৪)-এর একটি অভিযোগের বিষয় উঠে আসে। তিনি তাঁর স্বামী রাকিব হাসান হৃদয়সহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে যৌতুকের দাবিতে মারধর ও গুরুতর আহত করার অভিযোগ করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, থানায় মামলা করতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।
আদালত অভিযোগকারীর বক্তব্য গ্রহণ, তাঁকে পরীক্ষা এবং উপস্থাপিত কাগজপত্র পর্যালোচনা করে অভিযোগটি মামলা হিসেবে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখতে পান। পরে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআইকে দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করতে দাগনভূঞা থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালতের আদেশে বলা হয়, মারজাহানের চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্রে মাথায় আঘাতসহ বিভিন্ন শারীরিক আঘাতের তথ্য রয়েছে। গুরুতর আহত একজন নারীকে পুলিশ উদ্ধারের পরও তাঁর অভিযোগ কেন মামলা হিসেবে নেওয়া হয়নি, তা আদালতের কাছে বোধগম্য হয়নি।
আরেক গৃহবধূর মামলার বিষয়ও ওঠে
শুনানির সময় আইনজীবীরা একই থানায় তানিয়া আক্তার (২২) নামে আরেক গৃহবধূকে যৌতুকের দাবিতে হত্যার অভিযোগের বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন।
আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় গৃহবধূকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ করা হলেও থানায় মামলা নেওয়া হয়নি।
আদালত আদেশে উল্লেখ করেন, পৃথক দুটি ঘটনায় মামলা গ্রহণে পুলিশের অস্বীকৃতির অভিযোগ, আইনজীবীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনায় বিষয়টি গুরুতর বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত দাগনভূঞা থানার ওসিকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার, অভিযোগগুলোর তদন্ত এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ফেনীর পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন।
পুলিশ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে
ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার আদালতের আদেশ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, ওসিকে প্রত্যাহার ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আদালতের আদেশের পত্র পুলিশের হাতে এসেছে। এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট সাহাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, দাগনভূঞা থানার ওসি বিচারকের এজলাসে প্রবেশ করেছেন বলে তিনি শুনেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, আদালত থেকে নিচে নামার সময় ওসি নোমানকে কিছুটা হতাশ দেখাচ্ছিল। এ সময় অসুস্থতাবোধ করলে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে ধরে নিচে নামতে সহযোগিতা করেন।
প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ, আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্ত ও পরবর্তী বিভাগীয় প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

Comments
Post a Comment